হ্যালোউইনের পাড়া
রাস্তায় বেরোতে চায় না ও, মানুষের ধারে কাছেই ঘেঁষতে চায় না, দূর থেকে দেখে। ওর ঝুলে পড়া কোঁচকানো ত্বক- কর্কশ ও অস্বাস্থ্যকর কালচে, উঁচিয়ে থাকা নীল সবুজ শিরা উপশিরা, শরীরময় রহস্যজনক কালো খয়েরি ছোপছাপ, জুতো মোজা হীন ফোলা পায়ের পাতা, ধারালো নখ, রুক্ষ চুল; স্নান না করা ময়লা জমা শরীরে প্রাচীন ও একমাত্র ড্রেসিং গাউন, অন্তর্বাসহীন। ও বাজার করে না, ফলে, রান্নাও নয়। ওর ভাইপো কিম্বা ভাইঝি, নাতি অথবা নাতনি বা সহৃদয় পড়শিদের কেউ প্রতি রবিবার ওর বাড়ির সামনের বারান্দায় ওষুধ আর খাবার রেখে , দরজায় টোকা দিয়েই হাওয়া হয়ে যায়। দরজা সামান্য ফাঁক করে ওর শিরা ওঠা শীর্ণ হাত সেসব ভিতরে টেনে নেয়। ওর শোয়ার ঘর থেকে রাস্তা দেখা যায় না, সারাদিন বাইরের ঘরের সোফায় বসে পর্দা সরিয়ে পাড়া দেখে ও। আয়তক্ষেত্রাকার জানলার বাইরে পাড়ার পথ, লম্বা লম্বা ইউক্যালিপটাস থেকে বাকল খসে পড়ছে , উল্টোদিকের বাড়ির কেয়ারি করা বাগানে নুড়ি বিছানো, ছোটো গাছ, বাহারি লেটার বক্স। এ' সব দৃশ্য ওর জানলা থেকে দিনের আলোয় একরকম, রাতে একেবারে আলাদা; প্রায় মাঝরাতে ও যখন চুপিসারে ট্র্যাশ বিনে ময়লা ভরা থলি ফেলতে আসে তখন উল্টোদিকের বাড়ি, ইউক্যালিপটাস, কেয়ারি করা বাগান , রাস্তা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা স্থবির শকট- যেন এক পপ আপ বইয়ের পাতায় ঠিকরে ওঠা কার্ডবোর্ডের পাড়া - একমাত্রিক, প্রাণহীন; এই সময় গোটা দুনিয়াকে ওর স্বার্থপর দৈত্যের চিরতুষারাবৃত বাগান মনে হয় যেখানে চারদিক ঘেরা মস্ত উঁচু এক পাঁচিলের গায়ে লাল রঙের পোঁচ মেরে লেখা-"ট্রেসপাসারস উইল বি প্রসিকিউটেড।"
সমস্ত দিন জানলার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে ও - রাস্তায় গাড়ি, পাড়ার লোকজন- স্বাস্থ্যসচেতন ব্যায়ামবীর, নিয়মানুবর্তী অফিসযাত্রী, ঘোরতর পশুপ্রেমী, সান্ধ্যবায়ুসেবনকারী ঢিলেঢালারা, প্যারাম্বুলেটরে শিশু, আর স্কুলের ছেলেমেয়ে- স্কুল ফেরতা বা বিকেলে খেলার সময় যাদের কেউ কেউ ওর বাড়িতে এক আধটা ঢিল ছোঁড়ে অথবা মূল দরজায় ধাক্কা মেরে পালায় - বোধ হয় পরখ করে এ বাড়ি পরিত্যক্ত কী না; কেউ ডিম ছুঁড়েছিল সদর দরজায় বহুবছর আগে, সে সব গন্ধ , চিহ্ন ঝড় জল আর সময় গিলে নিয়েছে- খেয়াল করলে হয়তো ক্ষীণ একটি ধারা নজরে আসবে; পাথর বা ডিম ছোঁড়ার পরেও এ বাড়ির কোনো বাসিন্দা বেরিয়ে না আসায় দুষ্টু ছেলেপুলেরা আমোদের অভাব বোধ করে ক্ষান্ত দেয়, তদুপরি আগাছাসংকুল ঘাসজমিতে দু একটি সর্প দর্শন তাদের অধিক কোনো আক্রমণাত্মক ও অনিষ্টকারী খেলা থেকে বিরত রাখে।
ওর বাড়ির সামনের বারান্দা ধুলো কাদা পাখির বর্জ্য চুলের নুটি গাছের পাতা ভাঙা ডাল আর নড়বড়ে দুই আরামকেদারার সহাবস্থান, সেই সব আরামকেদারায় কত বছর কেউ বসা দূরস্থান, আঙুলটুকুও ছোঁয়ায় নি, বাইরের রোদ জলে ক্যানভাসের অংশ শতচ্ছিন্ন, তবু কাঠের ফ্রেমে এক চিলতে সবুজ- সাদা ডোরাকাটা অংশ জয়পতাকার মতো পতপত করে নিজেদের নাছোড়বান্দা অস্তিত্ব জানান দিয়ে যাচ্ছে। বাড়ির সামনের জমিতে ঘাস, আগাছা গোড়ালি ছাড়ানোর আগেই পাড়ার কেউ না কেউ দায়িত্ব নিয়ে সাফ করে- পাড়ার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখার খাতিরেই ; লন মোয়ার ঠেলতে ঠেলতে তাদের আসতে দেখলেই ও পর্দা টেনে শোয়ার ঘরে ঢুকে যায়, বন্ধ দরজা ভেদ করে ঘাস কাটার যন্ত্রের ঘড়ঘড় আওয়াজ ঢুকে আসে, এবং কর্তিত তৃণগন্ধ। সে সব মিলিয়ে গেলে ও আবার সামনের ঘরে আসে , পর্দা সরিয়ে সোফায় বসে যেন ভিউ মাস্টারে চোখ রাখে যেখানে সকাল দুপুর বিকেল সন্ধ্যার রীল ঘুরে ঘুরে আসে যায়। রাস্তার এপার আর ওপারে যেন দুই স্বার্থপর দৈত্যের বাগান- রাস্তার ওপারে যেমন ওর প্রবেশাধিকার নেই বলে ও ভেবে এসেছে আজ কতকাল, ওর বাড়ির চত্বর নিয়েও পাড়ার মানুষের ভাবনা তেমনই।
আজ হ্যালোউইনের বিকেল নেমেছে সদ্য। কিছু আগে এক পশলা বৃষ্টির জলকণা বাতাসে, রাস্তার অ্যাশফল্ট ভিজে রয়েছে; অল্পবয়সীরা মুখোশ ,পরচুলা বা মুখে রং মেখে, বিবিধ কস্ট্যুমে রাস্তায়; শিশুর দল বিকেল পড়তেই মা বাবার হাত ধরে বেরিয়েছিল, গৃহস্থের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঝোলা ভরা টফি, লজেন্স নিয়ে এখন স্বগৃহে ফিরে যাচ্ছে; পাড়ার বাকি সব ছেলেমেয়েরা বেরিয়েছে তার পরে - বাড়ি বাড়ি গিয়ে দরজায় টোকা দিচ্ছে এখন। বছরের এই দিনটায় বিকেল হলেই ও পর্দা টেনে ভিতরের ঘরে ঢুকে বসে থাকে; ওর দরজার বেল বহুদিনই অকেজো, শোয়ার ঘর থেকে টের পায় বাইরের বারান্দায় পায়ের আওয়াজ, কলরব , দরজায় মৃদু আঘাত,; দু হাতে হাঁটুতে বেড় দিয়ে ও তখন আরো ঘন হয়ে বসে যেন নিজেকেই ভাঁজ করে নিজের মধ্যে পুরে নেবে। শরীর এইটুকু মোচড়ও সয় না- শীর্ণ পিঠ, বুকের খাঁচা থরথর করে কাঁপে। আজও এইরকমই ঘটছিল বিকেল থেকে।
তবে সন্ধ্যার ঠিক আগে একটি নাছোড় দলের আগমন ও টের পাচ্ছিল; শুনতে পাচ্ছিল ওদের একটানা দরজা ধাক্কানো, ওদের কলরব, হাসি, চেঁচিয়ে ওঠা- " ট্রিক অর ট্রীট?" ও ওর সমস্ত শরীর ধনুকের মতো বাঁকিয়ে ওদের চলে যাওয়ার প্রতীক্ষা করছিল; এক সময় হাসি কথা থেমে গেল, পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে এল- বোঝা যাচ্ছিল ওরা ওর সামনের দরজা থেকে সরে যাচ্ছে। এদিকে, শোবার ঘরে বাইরে আলো পড়ে এসেছে, দেওয়ালে দিবসান্তের আলো আর ছায়া একটা প্যাটার্ন তৈরি করেছে - আর ঘন্টা খানেকের মধ্যে এবারের মতো হ্যালোউইনের পালা শেষ ভেবে ও যখন নিশ্চিন্ত হতে চাইছে, ঠিক তখনই ভয়ানক চমকে উঠল; দেখল, ওর শোয়ার ঘরের জানলায় নাক ঠেকিয়ে পাঁচ ছ জনের একটি দল- দু হাত জড়ো করে চোখের খুব কাছে নিয়ে ঘরের মধ্যের ওকে ঠাহর করতে চাইছে। ওর বুক প্রথমে কেঁপে উঠল ভয়ে, উদ্বেগে- কতকাল সে কোনো মানুষের মুখোমুখি হয় নি, চোখে চোখ রেখে কথা বলে নি; বুকে হাতুড়ির ঘা পড়ছিল যেন, লাবডুব এত দ্রুত যে মনে হচ্ছিল হৃদপিন্ড ওর অভ্যন্তর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসবে এবার; তারপর জানলার বাইরের মুখগুলিকে ওর ক্ষীণ দৃষ্টিতে ঠাহর করল যখন, হৃদস্পন্দন ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে এল; পড়ন্ত গোধুলিবেলায় এই মুহূর্তে ওর জানলার বাইরে যে মুখ কটি , তার কোনটিই মানুষের নয়- ভূত প্রেত বন্য অথবা গৃহপালিত প্রাণী কিংবা রোবট । ও গুঁড়ি মারা অবস্থান থেকে প্রথমে হামাগুড়ি দিয়ে জানলার কাছে পৌঁছতে চাইল, তারপর ক্রমশ সোজা হয়ে দাঁড়াল। কাচের ওপার থেকে ওরা দেখছিল একজন সাদাচুল গুহাবাসী , হাঁটু অবধি ড্রেসিং গাউন - আধো আলোয় যেন এক কোলকুঁজো রোমশ নগ্ন শরীর। ওরা হাত নেড়ে ওকে ডাকছিল। মানুষ ব্যতীত অন্য জীব বা যন্ত্রের কাছে যেতে ও দ্বিধা করল না; পা ঘষে ঘষে বেরিয়ে এল সামনের দরজা পেরিয়ে ঘাসজমিতে।
চাঁদের আলোয় রাস্তা পার হচ্ছিল ট্রিক অর ট্রীটের দলটা যেখানে রয়েছে রোবট, বাঘ, সিংহ, ড্রাকুলা, আর একজন গুহামানব।
[প্রথম প্রকাশ : প্রবাসী, শরৎ, ১৪৩৩]
অসাধারণ ❣️
ReplyDelete