ডুবোজাহাজ

 


ভোরবেলার এই সময়ে নিজেকে অ্যাকোরিয়ামের মাছের মতো লাগে- যেন এক পাত্র পরিচ্ছন্ন জল, আলো জ্বলছে, চাহিদামাফিক ঊষ্ণতা, তলায় নীল বেগুনি নুড়ি, বুড়বুড় করে হাওয়া মিশছে জলে,  হাঁ করা মুখের খুব কাছে খাবারের দানা, অথচ বাসস্থানের দেওয়াল কাচের অর্থাৎ চূড়ান্ত ভঙ্গুর এবং স্বচ্ছ - বাসিন্দার ওপর নিরন্তর নজরদারি আর আশ্রয়্চ্যুতির সম্ভাবনা এতই প্রবল যে বাঁচার প্রতি মুহূর্তে আশ্রয় এবং জীবন হারানোর ভয়-  যা ভুলে থাকতে পারলেই নিশ্চিন্তে সাঁতার কাটা সম্ভব। এই যে ভোরের সময়টা, যখন বাইরে আলো ফুটছে সবে, বাথরুমে যেতে হবে, মশারির মধ্যে নিজেকে অ্যাকোরিয়ামের মাছ মনে হয়- অথচ নিজের ঘর, নিজের  বিছানা বালিশ, দিব্যি হাওয়া বাতাস খেলছে- মেঝেয় পা রাখতে গিয়ে ভাবি,  আজই হয়তো সব ভেঙে পড়বে- হয়তো সেরিব্রাল স্ট্রোক, ম্যাসিভ অ্যাটাক কিম্বা  ভোরের দিকে  মানুষকে আশ্রয়হীন করার যে যে চক্রান্ত ঘটে থাকে; মাথা পা টলমল করে ওঠে,  হৃদপিণ্ড যেন চলকে গলায় আসে, টক জলে মুখ ভরে যায়; আরো একবার নিজের জীবনকে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যহীন মনে হয় - যেন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিচ্ছু বাকি নেই।

 

মাছেরা এ সব জানে না। বাথরুমে যাওয়ার সময় প্যাসেজে, অ্যাকোরিয়াম থেকে উৎসারিত নীল আলো , মাছ সাঁতরায় -কমলা নীল হলুদ বেগুনি ছোটো মাছ এদিক থেকে ওদিক, ওদিক থেকে এদিক, ওদের ভয় নেই- কাচের ভঙ্গুরতা বিষয়ে অজ্ঞ, স্বচ্ছতায় অভ্যস্ত। এমন নিশ্চিন্তে সাঁতরায়, জলও এতই নিস্তরঙ্গ - দ্বিমাত্রিক এক ক্যানভাস মনে হয় কখনও, যেন এথ্রি সাইজের কাগজে  নীল রং এর পোঁচ, সেই ব্যাকড্রপে রঙীন মাছ সকল- দীঘল চোখ কিম্বা অনুভূমিক রুইতন বা ঘুড়ির মতো আকার.  এই ফ্ল্যাটে জীবন বলতে আমি আর মাছেরা; কমোডে ফ্লাশ করে মনে হল আজ তপনের আসার দিন।

এক মাস আগে তপন বলেছিল, নেতাজীকে ও সুবলের দোকানে চা খেতে দেখেছে। ব্লাডপ্রেশার মেপে , কাফ গুটিয়ে ব্যাগে ভরতে ভরতে তপন বলেছিল- "একশো তিরিশ, পঁচাশি। আইডিয়াল একদম। কাল রক্ত নিতে আসব সকালে, আজ দশটার মধ্যে খেয়ে নেবেন কিন্তু -ঊজ্জ্বলামাসিকে বলে যাচ্ছি।" তারপর চেয়ারের ওপর ব্যাগ রেখে আমার খুব কাছে এসে নিচু হ'ল,  কানের পাশে  মুখ এনে প্রায় ফিসফিস করে বলল -" এখানে আসার আগেই দেখলাম- সুবলের দোকানে। চা খাচ্ছেন আর কাগজ পড়ছেন। ধুতি পাঞ্জাবি, চশমা, চেহারা- সব একই আছে, খুব কিছু বদলায় নি।"

- কে?

- নেতাজী। সুভাষচন্দ্র বসু।

এ'কথা শুনে আমি একেবারেই চমকে যাই নি কারণ তপন  আগেও তাঁকে দেখেছে- ব্যারাকপুরে, দমদম এয়ারপোর্টে, নোয়াপাড়া জংশনে; একবার পুরী বেড়াতে গিয়ে জগন্নাথ মন্দিরের সিঁড়িতে বসে দেখেছিল- তপন মন্দিরের দিকে যেতে যেতে তাঁকে খেয়াল করে;  তপন বলেছিল, " কাকু, বিশ্বাস করবেন না, ম্যাক্সিমাম এক মিনিট চোখের আড়াল করেছিলাম, দৌড়ে ফিরে এসে দেখি,  সিঁড়ির ঐ ধাপে কেউ নেই, শুধু একটা পদ্ম ফুলের মালা -ঐ যে  মন্দিরের সামনে বিক্রি হয়, সেই মালা";  এর পরে দার্জিলিংএর ম্যলে ওভারকোট পরে ঘোড়ায় চড়ে তাঁকে ঘুরতে দেখে কোনো রিস্ক নেয় নি তপন, নিজের ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে নেতাজীর ঘোড়াকে ধাওয়া করে ছিল; আচমকা গতি বাড়ানোয়, তপনের ঘোড়ার লাগাম হাতে ছেলেটি ছিটকে পড়ে, এক টুরিস্ট দ্রুত ধাবমান অশ্বর ভিডিও নিতে গিয়ে আহত হয়, ফলে স্থানীয় মানুষ, টুরিস্টরা তপনকে নেতাজীর কাছে পৌঁছোনোর আগেই আটকে দেয়। এই সব গল্পই তপন আমাকে বলে এসেছে, এই আলিশান অ্যাপার্টমেন্টে আসা ইস্তক।

 

বহুতলের এই ফ্ল্যাট আর উজ্জ্বলার রান্না,বাসন মাজার মতো তপনও আমার ছেলের বন্দোবস্ত - নিয়মিত  প্রেশার মাপা, রক্ত পরীক্ষার জন্য স্যাম্পল নেওয়া; একটা প্যাথলজি ল্যাবে চাকরি তপনের - আমার রক্ত, মল মূত্র ঐ ল্যাবেই যায়।  প্রেশার মাপতে মাপতে, সিরিঞ্জে রক্ত টানতে টানতে তপন  মৃদু স্বরে নেতাজীর  গল্প বলে যায় গুনগুন করে।

আমারও নিজস্ব গল্প অনেক -যা শোনার কেউ ছিল না; ছেলে বিদেশবাসী ও ভয়ানক ব্যস্ত- কুশল সম্ভাষণেরই সময় নেই তার;  বয়সের কারণেই মূলত, পুত্রের কড়া নির্দেশে  এ ফ্ল্যাট থেকে বেরোনো বারণ আমার- ফলে প্রতিবেশীদের কাউকেই চিনি না, আত্মীয় বন্ধুদের বাড়ি যেতে পারি না, ফোনে তারা কথা শুনতে পায় না আমার যেন একই সঙ্গে সবাই বধির হয়ে গিয়েছে অথবা মোবাইলের টাওয়ারে টাওয়ারে দীর্ঘস্থায়ী সারাই-অযোগ্য এক সমস্যা;  উজ্জ্বলারও সে সব গল্পে আগ্রহ নেই- টিভি খুলে অতি সোচ্চারে সে রান্না করে, বাসন ধোয়, ঘর পরিষ্কার করে,  অবসরে সে আমাকে সিরিয়ালের গল্প বলে আর আমি গল্প বলা শুরু করলেই -" ও মেসো, এখন আমার ছত্রিশ জায়গায় কাজ , পরে শুনব" বলে মোবাইলে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে পড়ে। সে যে কাজের বাড়ির সংখ্যায় যথেষ্ট জল মেশাচ্ছে তা বুঝলেও শুধরোতে যাই না - উজ্জ্বলা যে তার ব্যস্ততায় তৃপ্ত -এই বোধটুকু আমাকে আনন্দ দেয় - ব্যস্ততাহীনতাকে অভিশাপ ভাবি এখন; তপনের যাতায়াত শুরু হলে আমরা পরস্পরের গল্পগুলি বিনিময়ের সুযোগ পাই। আমার গল্প ভয়ানক ও আশঙ্কামূলক- পৃথিবীর ভবিষ্যত নিয়ে যাবতীয় খবর সংবাদপত্র থেকে সেঁটে রাখি খাতায়- সে সবই বলেছি তপনকে;  বলেছি, এরপর তপনের কিম্বা উজ্জ্বলার কাজ রোবটরা করবে, প্রবীণদের দেখাশোনার জন্য তাদের সন্তানরা রোবটদের নিয়োগ করবে- তারাই রান্না করবে, ঘর সাফ করবে, রক্ত টেনে নিজেরাই অ্যানালিসিস করে রিপোর্ট পাঠাবে প্রবাসী ছেলে মেয়েকে, হয়তো, গল্পও বলবে, শুনবে।  ইদানিং পৃথিবীর চৌম্বক মেরু নিয়ে কথা  হচ্ছিল আমাদের- উত্তর চৌম্বক মেরুর ক্রমশ সরে যাওয়ার কথা বলছিলাম আমি, তপন বলেছিল, " এখন সরছে না আগেও কখনও এমন হয়েছে?"

"ধীরে ধীরে সরে , এতকাল তাই হয়েছে, এখন দ্রুত সরছে; "দ্রুত" শব্দে জোর দিতে গিয়ে বিষম খেলাম। তপন বোতল থেকে ছোটো গেলাসে জল ঢেলে সামনে ধরেছিল -"আচ্ছা কাকু, ম্যাগনেটিক পোল তাড়াতাড়ি  সরলে কী হয়? ভূমিকম্প হতে পারে? সুনামি?"

- খুব তাড়াতাড়ি বদলে গেলে, ভূমিকম্প, সুনামি হবে- কিন্তু সে রকম হওয়ার কথা নয়;  এখন যে গতিতে বদলাচ্ছে, তাতে কিছু পরিবর্তন তো বোঝাই যায়- যেমন ধরো-

- ওয়েদার? এখন তো ঠান্ডা গরমের কোনো মাথা মুন্ডুই নেই, এবারে শীত তো পড়েই নি তেমন, আর কী গরমটাই না পড়েছে দেখুন-

- অনেক রকম অসুবিধে -জাহাজের, এরোপ্লেনের নেভিগেশনে অসুবিধা হতে পারে- ফলে বড়ো কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে-

-তাহলে তো পরিযায়ী প্রাণীদেরও অসুবিধে -

-ম্যাগনেটিক ফিল্ড খুব তাড়াতাড়ি বদলালে পাখিদের অসুবিধে হয়;  হয়তো সাইবেরিয়া থেকে পাখিদের এখানে আসার কথা , পথ ভুল করে অন্য কোথাও পৌঁছে গেল-

 তপন মাথা নাড়ে, চুক চুক আওয়াজ করে মুখে, বোতল থেকে জল ঢালে গলায় - "আচ্ছা কাকু, পাখিরা এক জায়গায় থেকে  অন্য জায়গায় যায় কেন?"

" শুধু পাখিরা কেন, কচ্ছপ, মাছেরা, কাঁকড়া- খাওয়ার অসুবিধে হলে, আবহাওয়ায় কষ্ট হলে.." আমি কর গুণে গুণে বলতে থাকি। তপন থামায় আমাকে " তার মানে কাকু, পরিযায়ী শ্রমিকের মতই তো হল, এখানে কাজ নেই, কেরলে যাচ্ছে, কত জায়গায় মার খাচ্ছে বলুন? ..কতজন মারা গেল কোভিডের সময়- আমার নিজেরই... " থেমে গিয়ে আবার জল খায় তপন।

- সে তো বটেই, তবে পরিস্থিতি বদলালে পরিযায়ী প্রাণী নিজের জায়গায় ফিরে আসে- ধরো শীত কেটে গেলে পাখিরা আবার ফিরে যায়, ডিম পেড়ে কচ্ছপরা ফিরে আসে- মাইগ্রেশন মানেই সাময়িক, ফিরে আসবে বলেই যায়-

- তার মানে , অবস্থা অনুকূল হলেই নেতাজী ফিরে আসবেন?

- কে নেতাজী?

- নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু-ফিরে আসবেন উনি; কাকু আমি ওঁকে দেখেছি-

- কী সব বলছ!  এক কালে নেতাজীকে নিয়ে এরকম অনেক গল্প শোনা যেত কিন্তু এখন! ওঁর বয়স কত হত ভাবো তো-মানুষ অত দিন বাঁচে নাকি?

- যে পাখিরা শীত শেষ হলে সাইবেরিয়া ফিরে যায়, আপনি জানছেন কী করে - তারা একই পাখি??

-মানে?

তপন ভাবে, জল খায়, গলা খাঁকারি দিয়ে শব্দ গুছোয়-" কাকু,  মনে  করুন  একটা পাখি, সাইবেরিয়ার পাখি- আমার আপনার চোখে তারা সবাই এক রকম  কিন্তু কাক চড়াই বা শালিখের থেকে তারা যে আলাদা তা তো বুঝতে পারি- সে রকমই-ধরুন, কাকু, সুভাষচন্দ্র বসু যেমন ছিলেন তেমন কেউ, সবার থেকে , আমার আপনার থেকে একদম আলাদা-তাঁকেও তো নেতাজী বলতে পারি -"

এই খান থেকে তপনের নেতাজী দর্শনের গল্পসমূহের সূচনা হয় - ব্যারাকপুর, এয়ারপোর্ট, পুরী , দার্জিলিং হয়ে নেতাজী এক মাস আগে আমাদের  পাড়ার চায়ের দোকানে। এবং ব্যাপার এবারে সিরিয়াস- তপনের সঙ্গে নেতাজীর কথা হয়ে গেছে - ফৌজ তৈরি করছেন নেতাজী। সৈনিক খুঁজছেন।

- কাকু আপনি রেডি?

- কিসের জন্য?

- নেতাজী ডাকলে যাবেন ?

- তপন, অনেক হল, এবার থামো। মন দিয়ে ব্লাডটা টানো-

তপন গলা নামায়- " এই রক্ত নেতাজীর কাছে নিয়ে যাবো কাকু- আমাকে এই কাজ দিয়েছেন - সারাদিনের কালেকশন উনি খুঁটিয়ে দেখবেন-

" এসব উনি করবেন কোথায়? তোমাদের ল্যাবে চাকরি নিলেন নাকি?" আমি হাসতে থাকি।

তপন হাসে না, রেগেও যায় না; শান্তভাবে বলে -" কেন? নিজের ল্যাবে, সাবমেরিনের ল্যাবে."

- সাবমেরিন?

- বলি নি ? নেতাজী এখন সাবমেরিনে , জলের নিচে-ওখানে ল্যাব ট্যাব সব আছে-

- তুমি গিয়েছ?

- না না , ঐ সাবমেরিনে শুধু সেনা বাহিনী উঠবে- নেতাজী বলেছেন, আমি স্যাম্পল রেখে আসব প্রিনসেপ ঘাটে-নেতাজী ওখান থেকে নিয়ে নেবেন-

আমি তপনের জন্য সবিশেষ চিন্তিত হয়ে পড়ি এই সময়। এতদিন টুকটাক গুলগল্প শুনতে বেশ লাগত- তপনের গাঁজাপ্রীতি ছাড়া আর কিছু সন্দেহ হয় নি কোনোদিন।

-তোমাদের ল্যাবে যে ডাক্তারবাবুরা বসেন, তাঁদের কাউকে একবার চেকাপ করিয়ে নেবে?

-কেন কাকু? কী হয়েছে আমার?

- না এই গরম, ঘুরে ঘুরে কাজ তোমার-

- আপনি ভাবছেন, মাথার গোলমাল হয়েছে আমার?  না কাকু। সত্যি আমি নেতাজীকে দেখেছি। কথা হয়েছে। বরং আপনি ভাবুন-নেতাজী ডাকলে কী করবেন?

- এই যে তুমি বলছ আমাকে ডাকবেন? কী ভাবে ডাকবেন? সাবমেরিন থেকে ফোন করবেন?

- জানি না কাকু। নিশ্চয়ই কোনো ব্যবস্থা আছে নেতাজীর- সেভাবেই সংকেত পাঠাবেন একদিন।

 

আজ সকালে রক্ত নিতে তপনের আসার কথা ছিল।  এলো না। ওর ফোন বেজে গেল। একবার দুবার তিনবার। উজ্জ্বলা বাজার থেকে এসে রান্না বসিয়েছে-" উজ্জ্বলা, তপনকে দেখলে কোথাও?"

-কোথায় আর দেখব মেসো?

- এই যে তোমার ছত্তিরিশটা বাড়ি, বা ধরো বাজারে , পথে ঘাটে? সুবলের চায়ের দোকানে দেখলে কাউকে?

- আমার কি মাথা তুলে দেখার সময় থাকে? দেখি নি তপনকে। কাল আসবে হয়তো- ফোন করে দ্যাখেন না মেসো-

পরদিনও এলো না তপন; মোবাইল বেজে যাচ্ছিল যথারীতি। তপনের জন্য চিন্তা হচ্ছিল; ওর ঠিকানা বা অন্য কোনো কনট্যাক্ট আমার কাছে নেই। আমার ছেলে হয়তো ঠিকানা জানে, কিন্তু সে ব্যস্ত , তার ওপর ও দেশের সময় মিলিয়ে ফোন করতে গেলে যোগ বিয়োগের অঙ্কে আমার মাথা গুলিয়ে যায়; তপনকে নিয়ে আমার উদ্বেগের কথা ছেলে বুঝবেও না -ফোন করলে হয়তো বিরক্ত হবে; যে প্যাথোলজি ল্যাবে তপন কাজ করে সেখানে ফোন করলাম। একটি মেয়ে , সম্ভবত রিসেপ্শনিস্ট- দু তিন বার বলল-" হ্যালো কে? কার কথা বলছেন? তপন? তপন? অ্যাঁ তপন? ঐ নামে তো- আচ্ছা আপনি স্বপনের কথা বলছেন না তো? বা তরুণ?"

ফোন রেখে দিলাম।

 

ফ্ল্যাট থেকে না বেরিয়ে ভয় জন্মেছে এমন, দরজার  বাইরে এক পা রাখলে নিজেরই মনে হয় -  কনকনে ঠাণ্ডা জলে পা ডুবল, আরো এগোলে জল বাড়বে, একসময়ে অগাধ হবে- স্রেফ  তলিয়ে যাবো আমি। ঘরে বসেই তপনের জন্য অপেক্ষা করা আর কী উপায়?

" অত চিন্তা কোরো না মেসো, শরীর খারাপ হবে; কাল না এলে, ওর কোম্পানির  ঠিকানাটা আমাকে দিও- আমার মোটেই টাইম নেই,  বরকে খোঁজ নিতে পাঠাবো, সে তো কাঠমিস্ত্রি-কাজ নেই; সবাই রেডিমেড খাট পালং কেনে তো"- রাতের রুটি করে উজ্জ্বলা বেরিয়ে পড়ল। গোটা ফ্ল্যাটে এখন আমি আর মাছেরা শুধু।

 

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, হঠাৎ মাঝরাতে উঠে পড়েছি- বাথরুমে যাবো; প্যাসেজে অ্যাকোয়ারিয়ামের যে আলো এসে পড়েছে তাকে কাঁপতে দেখছিলাম যেন ঢেউ উঠেছে জলে; দেখলাম মাছেদের চলাচল বদলে গিয়েছে একদম - কমলা নীল হলুদ বেগুনি ছোটো মাছের দল অস্বাভাবিক দ্রুত সাঁতরাচ্ছে, ঠোক্কর দিচ্ছে জলপাত্রের কাচের দেওয়ালে, দিক বদলাচ্ছে পরক্ষণেই, ওদিকের দেওয়াল ছুঁয়েই উল্টোদিকে দৌড়ছে; চোখের সামনে কমলা আর সোনালী ঘাই দিল এমন, অ্যাকোরিয়াম কেঁপে উঠল থরথর করে; সেই কাঁপুনি যেন অনুভব করছিলাম আমি- শুধু জলপাত্র নয়, মেঝে কাঁপছে, আমার পায়ের তলার গ্র‌্যানাইট কাঁপছে,  অ্যাপার্টমেন্টের দেওয়াল  ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল - ভূমিকম্প? টেকটনিক প্লেট ঘষা খাচ্ছে মাটির তলায়? না কি চৌম্বকক্ষেত্র বদলে যাচ্ছে এই রাতেই? যেভাবেই হোক এখান থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামতে হবে আমাকে । ফ্ল্যাটের দরজা খুলে পা বাড়াতে গিয়ে ভয় করে উঠল- আমি পারব? আমার পিছনে মাছেদের অস্থিরতা ক্রমশ বাড়ছে; প্লাগপয়েন্ট থেকে অ্যাকোরিয়ামের যাবতীয় তার খুলে ,  দুহাতে তুলে নিলাম জলপাত্র- ভয় কমে গেল সঙ্গে সঙ্গে- মাছদের বাঁচাতে হবে আমাকেই-  এই বোধটা  ভয় ছাপিয়ে সাহস দিচ্ছিল ।  এমার্জেন্সির সময় লিফটে উঠতে নেই- ছেলে পই পই করে বলে দিয়েছে; অ্যাকোরিয়াম হাতে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে সিঁড়িতে নামতেই দেখলাম  মানুষ আর মানুষ- এত জন এই বহুতলে থাকে?  আমারই বয়সী  বৃদ্ধ বৃদ্ধা সব -কারো হাতে গাছের টব, ছোটো জলপাত্রে মাছ,  কোলে  বিড়াল, হাতে ধরা রশিতে ছোটো কুকুর। কাউকে চিনি না, নাম জানি না কারোর, তারাও চেনে না আমাকে- কিন্তু আমরা এ বাড়িরই বাসিন্দা আজ এত বছর, আমরা প্রতিবেশী। একসঙ্গে সিঁড়ি ধরে নামছিলাম -  সিঁড়ির ধাপ জলে ভাসা পদ্মের মতো দোল খাচ্ছে,  দেওয়ালে চিড় ধরেছে , পলেস্তারা খসে পড়ছিল ঝুর ঝুর করে, গুম গুম আওয়াজ উঠছিল কোথাও - অথচ তাড়াহুড়ো করছে না কেউ- যেন প্রত্যেকেই এই বিদ্যমান অবস্থানে ফ্ল্যাটের অভ্যন্তরের থেকে অনেক বেশি নিরাপদ ও আনন্দিত, যেন সবারই এক নির্দিষ্ট সুমহান লক্ষ্য রয়েছে। তপনের কথা মনে হল আমার- পাশের বৃদ্ধকে  জিজ্ঞেস করলাম- " আচ্ছা তপনকে চেনেন? তপন কি আপনার প্যাথোলজি টেস্টের জন্য রক্ত নিতে আসে?"

- আসে তো, তবে ওর নাম তো রতন।

ওপরের ধাপ থেকে কেউ একজন বললেন-" বিশুর কথা বলছেন আপনারা? বিশু? যে নেতাজীকে দেখেছে?"

মৌমাছিদের গুঞ্জনের মত একটা রব উঠছিল সিঁড়ি আর ল্যান্ডিং জুড়ে- সেই শব্দে অনেক নাম ছিল- বিশু রতন তপন দীপময় দেবু - তারা সবাই নেতাজীকে দেখেছে; বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের কাতারের একদম প্রথমে যে নারী, তিনি হাত উঁচু করে গলা তুললেন-" নেতাজী ডাক পাঠিয়েছেন- বুঝতে পারছি; সাবমেরিন প্রস্তুত"। সবার চোয়াল  দৃঢ় হচ্ছিল , সঙ্গের প্রাণীটিকে নিজের শরীরের আরো কাছে টেনে নিচ্ছিলাম  সবাই,  যেন এ যাত্রার শরিক পৃথিবীর সকল প্রাণ।

আমরা ক্রমে, নিশ্চিত হচ্ছিলাম, সিঁড়ি টুকু শেষ হলেই বিশু অথবা রতন অথবা তপন অথবা নিমাই কিম্বা সায়ন্তন আমাদের নেতাজীর সাবমেরিনে পৌঁছে দেবে। আমরা সবাই কদম কদম পা বাড়িয়ে বড় রাস্তার দিকে যাচ্ছি।


[প্রথম প্রকাশ: শারদীয় পরম্পরা, ১৪৩৩]


Comments

  1. পড়লাম মুগ্ধের মতো। একেই কি জাদু বাস্তবতা বলে ? একাকীত্বের সঙ্গে অনভ্যাসের জড়তা।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

অ্যানাগ্রাম

এলিজি

সিম্পল প্যাশন