জোহাৎসু
-যেমন?
- ধর সাওডাডা। জানিস?
আমি চুপ করে থাকি। বড়মাসি শব্দ বদলায় - " প্লুভিওফাইল ।"
- জানি-
-গুগল করলি না তো? আচ্ছা এইটা বল- ওয়াবি সাবি-
- কী ? ওয়াসাবি? সে তো ...
বড়মাসি পাত্তা দেয় না। নিজেই একটানা বলে যেতে থাকে। নতুন সব শব্দ। পোর্তুগিজ, জাপানি, ইংরিজি.. বুঝতে পারি, বড়মাসি আমার থেকে একদম নতুন কিছু শুনতে চায়। আমিও তো চাই বড়মাসিকে কিছু দিতে- কী দেব? আশ্চর্য এক রিভলভিং চেয়ার যাতে বসলেই বাঁই করে ঘুরে গিয়ে আবার জীবনের দিকে মুখ ফেরাতে পারবে একজন বিধ্বস্ত মানুষ? নতুন কী বা করতে পারি আমি? এই বয়সে একজন বড় অভিনেত্রী হবো? অস্কার পাবো? বা লিখে ফেলব ম্যাগনাম ওপাস? কিম্বা গায়িকা? ব্যালে নর্তকী? নিউ ইয়র্ক টাইম স্কোয়ারের বিলবোর্ডে বিলবোর্ডে আমার ছবি, স্কাইস্ক্রাপারের গা বেয়ে ঝুলন্ত গালিচার মতো আমার মুখ আলোয় আলোয় ফুটে উঠছে আর আমি সেখানে দাঁড়িয়ে ফোন করছি বড়মাসিকে? আজ ভোর থেকে এই সব চিন্তাই প্রকাণ্ড তিমি হয়ে গিলে খাচ্ছিল আমাকে।
অথচ গতরাতে স্বপ্নের মধ্যে বড়মাসি, মুক্তাদি, কেউ ছিল না; বাচ্চু নয়, কলেজ নয়। নিজের মুখও দেখতে পাই নি, তবু বুঝতে পারছিলাম আমি রয়েছি- আমি ই। দেখছিলাম, তিনকোণা ঘরে আয়না লাগানো আলমারির পাল্লা খোলা - আয়নায় একজনকে ঘাড় গুঁজে লিখতে দেখা যাচ্ছিল। আধো অন্ধকার ঘর, সবে ভোর হচ্ছে যেন, আয়নার পাল্লা দুলে দুলে উঠছে, আর নিমগ্ন লেখক ঘাড় গুঁজে লিখেই চলেছে, কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তারপর দেখলাম বাইরে রাস্তায় হাঁটছি, রাস্তা ফুটপাথ হয়ে যাচ্ছে, তারপরই আবার রাস্তা, আবার ফুটপাথ - যেন কোনো মাতাল টাল খেতে খেতে ভিডিও তুলছে অথবা ঝোড়ো বাতাসে পিচরাস্তায় ঢেউ উঠছে - রাস্তা আর ফুটপাথ জায়গা বদলাচ্ছে অবিরাম- যেন ঢেউয়ের মাথায় চড়ে ফুটপাথ আসছে, জল সরে যাওয়ার সময় রাস্তাকে নিয়ে যাচ্ছে স্রোত, আবার ফিরিয়ে আনছে, আর ফুটপাথকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে যাচ্ছে; আশ্চর্যরকম নির্গন্ধ ফুটপাথ, ডাইনে বাঁয়ে সারি সারি পুরোনো বইয়ের দোকান- অজস্র ক্রেতা, কোলাহল- "দিদি কী বই বলুন? মাধ্যমিকের সাজেশন লাগবে? ব্যাঙ্কের এক্জ্যাম? জিকের বই?" দেখলাম, প্রচণ্ড জনপ্রিয় উপন্যাস সব বান্ডিল করে রাখা, ধুলো পড়েছে- এত পুরোনো হয়ে গেল এরই মধ্যে? বই ছুঁতে হাত বাড়িয়েছি সবে; দেখি, দোকান সরে গিয়েছে ফুটপাথ থেকে আর ফিসফিস করে কেউ বলছে, " এখানে দাঁড়িয়ে পড়লে লেখকের সঙ্গে দেখা হওয়ার আশা নেই, উনি নটার পরে কারো সঙ্গে দেখা করেন না। কেউ থামছে না, সবাই হাঁটছে -ঐ যে..." ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছি, অজস্র আবছা অবয়ব হেঁটে যাচ্ছে, এক লাফে তাদের পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করে দিলাম। এত জোরে হাঁটছি, হৃদপিণ্ড যেন গলা দিয়ে জিভে উঠে আসবে এক্ষুণি; তীব্র উদ্বেগ- দেখা হবে তো?
এই স্বপ্নের কথা বড়মাসিকে বলা যায় আজ? স্বপ্ন দেখা কি নতুন কিছু?
বাচ্চু অনেক ভোরে উঠে অফিসের কাজ সারছিল ল্যাপটপে। দরজার ওপাশ থেকে গলা পাচ্ছিলাম- ক্লায়েন্টের সঙ্গে কথা বলছে - মীটিং চলছিল। স্বপ্নের কথা, আজকের সংকটের কথা এই মুহূর্তে বাচ্চুকে বলা যাবে না তার মানে। চায়ের জল বসাতে যাবো, বাচ্চু হাঁক পাড়ল -" আজ ডেন্টিস্ট এর সঙ্গে অ্যাপো সকাল এগারোটায়। মনে আছে তো?"
এক কথায়- মনে আছে- বলে দেওয়া সম্ভব ছিল না- বড়মাসির সঙ্গে কথা বলার চিন্তায় ভুলেই গিয়েছিলাম প্রায়; উত্তর দেওয়ার আগেই বাচ্চু বলল-" রাস্তা ভুলে গেলে গুগল ম্যাপ অন করে নিও।" আমি গলা তুলে "আচ্ছা " বলে গরম জলে টী ব্যাগ ভিজতে দিলাম। বাচ্চুর মীটিং আবার শুরু হয়ে গেল।
বাচ্চু আগলে রাখে আমাকে। আসলে রাস্তা গুলিয়ে ফেলা, ভুল বাসে উঠে গন্তব্যের বিপরীত দিকে চলে যাওয়া আমার স্বভাব। বিয়ের পর থেকে বাচ্চু এই নিয়ে অনেক ভুগেছে। তারপর একসময়ে মেনেই নিয়েছে আমার হিপোক্যাম্পাসে বড়সড় গোলমাল রয়েছে যার নিরাময় এই জীবনে সম্ভব নয়। একবার কী হয়েছে, বাচ্চুর প্রবল জ্বর , প্রচণ্ড দুর্বল, অফিস যায় নি, বাড়িতে শুয়ে; এদিকে আমার কলেজে পরীক্ষা, ইনভিজিলেশনের ডিউটি- যেতেই হয়েছিল; ফিরবার তাড়ায় ভুল বাসে উঠে পড়েছি। এদিকটা পাহাড়ি এলাকা; কলেজের স্টপ থেকে দুটো বাস আমাদের বাড়ির স্টপে থামে; আর একটা বাস পাকদন্ডী বেয়ে ছোটো নদীর দিকে যায়, একটা গোলচক্কর ঘুরে আবার উঠে আসে, কলেজের দিকে ফেরে। সেদিন প্রায়োরিটি ছিল যত তাড়াতাড়ি হোক, বাচ্চুর কাছে ফেরা; এদিকে বাস যেই মুহূর্তে নিচে নামতে শুরু করল, বুঝলাম ভুল হয়ে গিয়েছে। শীতের বেলা, ছাই রঙের আলোয়ানের মতো অন্ধকার ঘিরে ধরছে, নদীর দিকের ঘরদোরে আলো জ্বলে উঠছিল একে একে, বাসের জানলা দিয়ে জোলো হাওয়া ঢুকে পড়ছিল আর প্রায়োরিটি বদলে যাচ্ছিল আমার। চেঁচিয়ে ড্রাইভারকে থামতে বলব- কিন্তু কথা গিলে নিলাম; ভালো লাগছিল এই ক্রমশ জলের দিকে নেমে যাওয়া , এই অন্ধকার, সরণির এই সব মৃদু আলো, জলের হাওয়া, বাসের শান্ত সহযাত্রীদের। মনে হল , এক চক্কর ঘুরে এলে কী এমন ক্ষতি হবে? বাচ্চুকে -"দেরি হবে', চিন্তা কোরো না" মেসেজ করে জানলার কাচে গাল ঠেকিয়ে রাস্তা দেখতে লাগলাম। নদীর কাছে পৌঁছে টার্ন নিয়ে বাস ওপরে উঠতেই, নেমে পড়েছিলাম। তারপর যথারীতি রুটের বাসে। এই গল্পটা আজ বড়মাসিকে বলা যায়? এও তো নতুন কিছু নয়। হতে পারত। হয় নি।
টিউবরেলে ছ'টা স্টেশন। তারপর বাসে বা ট্যাক্সিতে ডেন্টিস্টের চেম্বার মাত্র পাঁচ মিনিট। বাচ্চুর সঙ্গে গেলে এইভাবেই যাই। আজ স্টেশনে নেমে মনে হল, সামান্য পথ- হেঁটে গেলে হয়। ম্যাপ বলছিল, উল্টোদিকের ফুটপাথে উঠে বাঁদিকের রাস্তা। এদিকে স্টেশন থেকে বেরিয়ে রাস্তা পেরিয়ে দেখলাম বাঁদিক বন্ধ, ডিট্যুর সাইন; একটা রাস্তা ঢালুর দিকে নেমে গিয়েছে- ম্যাপ দেখে মনে হ'ল, সে পথে সোজা গিয়ে একটা রাউন্ড অ্যাবাউট, সেখান থেকে বাঁদিক; একটু ঘুরপথ, সামান্য বেশি হাঁটতে হবে। হাতে সময় আছে। ঢালু পথ ধরলাম। এ অঞ্চলে পথচারী বেশ কম ; কুকুর নিয়ে দুই বৃদ্ধ ধীরে হাঁটছিলেন, বালকের হাত ধরে এক মহিলা প্রায় দৌড়ে পেরিয়ে গেলেন আমাকে- গন্তব্যে পৌঁছতে দেরি হয়ে যাচ্ছে মনে হল। তরুণ তরুণী কয়েকজন -হেসে গড়িয়ে পড়ছিল, হাঁটছিল, দাঁড়িয়ে পড়ছিল, আবার হাঁটছিল।
মিনিট পাঁচেক হেঁটে একটা বড়সড় চাতালে পৌঁছে গিয়েছিলাম , সেখান থেকে রাস্তা আবার নিচে নেমেছে - তবে তিনদিকে। চাতালে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, যে রাস্তা সোজা নেমেছে, তা মূলত চওড়া এক সিঁড়ি- প্রশস্ত ধাপ, দুদিকে রেলিং; বাঁ আর ডাইনের পথ সে' তুলনায় সামান্য এবড়োখেবড়ো, নির্জন, ঈষৎ ছায়াচ্ছন্ন। বাঁদিকে যেতে হবে জানি , সোজা গিয়ে আরো নিচে নেমে লেফ্ট টার্ন না কি এই চাতাল থেকেই বাঁদিক? মোবাইল খুলে ম্যাপ চালু করতে গিয়ে দেখি নেট নেই। মনে হল, এখান থেকেই বাঁদিকের রাস্তা ধরলে, বড়জোর এক কাণাগলিতে পড়ব; তখন আবার এই চাতালে ফিরে সোজা পথে রাউন্ড অ্যাবাউটের দিকে যাবো না হয়। বড়মাসির কথা ভাবতে ভাবতেই বাঁ দিকে হাঁটতে শুরু করেছি, ট্রাকসুট পরা এক যুবক স্প্রিন্ট টেনে বেরিয়ে গেল পাশ দিয়ে, তারপর একটি সাইকেল শুধু, তারপর আর কেউ না, সব চুপচাপ; অমসৃণ রাস্তার দুদিকে ঝুপসি গাছ, পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল। এই দুপুরের কাছাকাছি সময়ে মরচে পড়া রোদ, হাল্কা সিপিয়া আলোয় নিজের ছায়াকে মাড়িয়ে এগোচ্ছি; গাছের পাতায় পাতায় তৈরি ছাঁকনি নিয়ে যে আলো ঢুকছিল, তা বুজে আসছিল, যেন জঙ্গল পেরিয়ে ক্রমশ এক অরণ্যে ঢুকে যাচ্ছি। মুহূর্তের জন্য একবার মনে হল, ফিরে যাই। যে পথ ধরে এসেছি, সেই পথ ধরে ফিরে যাই, চাতালে পৌঁছে বাঁধানো সিঁড়ি বেয়ে রেলিং ধরে নেমে বড় রাস্তায় গিয়ে পড়ি। তারপরেই ভাবলাম, অকারণ হারিয়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছি, বরং বড়মাসিকে এই গল্পটা আজ বলা যাক।
আধো অন্ধকার পথ ধরে হাঁটতে থাকি, আচমকা রাস্তা চওড়া হয়, দুপুরের রোদ চোখ ধাঁধিয়ে দেয়; দেখি ঝুপসি গাছ সব উধাও, আমার সামনে এখন বৃত্তাকার সবুজ মখমল, চারদিকে গ্যালারি - জঙ্গলের পথ ধরে কোন এক স্টেডিয়ামে ঢুকে পড়েছি- ক্রিকেট খেলা চলছিল। খেলোয়ারদের সাদা জামা প্যান্ট, সাদা রঙের গ্যালারি, মাঠের চারদিকে সাদা বেড়া। গ্যালারির উচ্চতম স্থান থেকে গোটা মাঠকে এক বৃহৎ গর্ভপত্রের মতো লাগে যাকে ঘিরে সহস্র সাদা পাপড়ি। গ্যালারিতে দর্শকের আসা যাওয়া, দেদার বাদাম , লজেন্স, চা কফি বিক্রি হচ্ছিল; খেয়াল করলাম, সাদা বেড়ার গায়ে একটি গেট খুলে মানুষ ঢোকে বেরোয়। গ্যালারি থেকে নেমে ঐ গেট ঠেলে বেরোতে দেখি মাঠের পাশ দিয়ে যে ঘাসে ঢাকা পথ, তা শেষ হয়েছে পিচ রাস্তায়। ম্যাপ কাজ করছিল এখানে- পিচরাস্তায় পড়ে একটা রাউন্ড অ্যাবাউট পেরিয়ে সোজা হাঁটলেই ডেন্টিস্টের চেম্বার। ট্যাক্সিতে বা বাসে এলে জানতেই পারতাম না এই ক্রিকেট মাঠের কথা, জঙ্গলের কথা। নিজের ডিসিশনকে নিজেই সাবাস দিলাম। বড়মাসিকে সব বলব আজ।
গোলচক্কর পেরোতে কবলস্টোনের উঁচুনিচু পথঘাট, দুপাশের বাড়িঘর ভিক্টোরিয়ান টেরেস ধরণের, রাস্তার ওপরেই ঝুল বারান্দায় বাহারি গ্রিল, ছোটো ছোটো বাস্কেটে জেরানিয়াম, পেটুনিয়া; ফুটপাথ ফুঁড়ে প্রাচীন গাছ, ঝরা পাতা, চারকোণা জায়গা ঘিরে কমিউনিটি গার্ডেন। দেওয়ালে আগাগোড়া গ্রাফিতি- মূলত সমুদ্র সংক্রান্ত; নীল রঙের বিচিত্র সব শেডের মধ্যে লালচে অক্টোপাস, তার হাল্কা গোলাপী শুঁড়, বাদামি সব শোষক নল - ছোটো ছোটো বাটির মতো লেগে রয়েছে তাতে। কালো আর সাদায় মস্ত জাহাজ, হলুদ জেলিফিশ, সবুজ কচ্ছপ।
অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় হয়ে এসেছে। পা চালালাম। চেম্বারের কাছাকাছি এসে বাকি দিনের সমস্ত কাজের চিন্তা পেল্লায় ট্রাকের মতো আচমকাই হুড়মুড়িয়ে ধেয়ে এলো একসঙ্গে- এখান থেকেই কলেজ যেতে হবে তারপর বাড়ি; রাতে বাচ্চুর বন্ধুরা ক'জন আসবে - বাচ্চু বিরিয়ানি রাঁধবে, আমি চাঁপ। সব মিটিয়ে রাতের দিকে বড়মাসির সঙ্গে সময় ম্যাচ করে ফোন। দ্রুত পা চালালাম। বাসস্টপের গায়ে বেকারি , পুরোনো গির্জে, তার উল্টোদিকে বেগুণী আলোয় ডেন্টিস্টের সাইনবোর্ড। দরজা ঠেলে ঢুকতে টুং করে ঘন্টা বাজলো। সিঁড়ির ধাপে পা রাখতে আরো একবার। সেন্সর লাগানো খুব সম্ভব । আগে দেখি নি। না খেয়াল করি নি?
ডেন্টিস্টের চেম্বারের ছবিটাও দেখলাম বেবাক বদলে গিয়েছে। আসলে ডেন্টিস্ট ভদ্রলোক হিচককের ফ্যান। বাচ্চুও। হিচককের সিনেমার ফেস্টিভ্যাল চলছিল শহরে – সেখানেই ভদ্রলোকের সঙ্গে বাচ্চুর আলাপ; আর তার পর থেকেই দাঁত সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যায় এখানেই আসে বাচ্চু। বছর কয়েক আগে, দাঁত নিয়ে খুবই ভুগছিলাম- বাচ্চু নিয়ে এলো এখানে। এখন প্রতিবছর দুজনে একসঙ্গে আসি নিয়ম করে স্কেলিং করাতে; এবং আনুষঙ্গিক চেকাপ। এবারই বাচ্চু জরুরী মীটিংএর জন্য আসতে পারলো না।।
হিচককের কথা হচ্ছিল, ছবির কথা বলছিলাম। বরাবর দেখেছি, ডেন্টিস্টের চেম্বারে রিয়ার উইন্ডো সিনেমার একটা দৃশ্য ফ্রেম করা - ফিল্মের স্টিল শটের প্রিন্ট নয়, অয়েলপেন্টিং - লোকাল কোনো আর্টিস্টের আঁকা- ডেন্টিস্টই বলেছিলেন একদিন; বস্তুত বাচ্চুর একটা থিওরি ছিল এই ছবিটা নিয়ে। আমিই জিজ্ঞেস করেছিলাম বাচ্চুকে, "এ তো তেমন বিখ্যাত কোনো সীন নয়; ভদ্রলোক এই ছবিটাই দেওয়ালে টাঙালেন কেন? অন্য কোনো সিনেমার দৃশ্য রাখলে বেটার হত না?"
- যেমন?
- বার্ডসের শেষে স্কুলের জাঙ্গল জিমের সীনটা। বা ধরো ক্যারি গ্রান্ট দৌড়োচ্ছে আর পিছনে সেই ক্রপ ডাস্টার..
- নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট, ব্যাপক -
- বা ঐ যে ক্যারি গ্রান্ট দুধের গ্লাস নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে- এই সীনটা ফ্রেম করলে কী দারুণ দেখাতো-
- আসলে কী জানো, অন্য মানুষের মুখের ভেতরটা দেখার মধ্যে একটা ভয়ারিজম আছে না?
-তা আছে- মুখের গন্ধ, পোকা খাওয়া দাঁত, দাঁতের ফাঁকের ময়লা- এ সব তো খুবই ব্যাক্তিগত-
- সে জন্যই মনে হয় রীয়ার উইণ্ডোর সীনটা বাঁধিয়ে রেখেছেন ভদ্রলোক। সিম্বলিক। আমার তাই মনে হয়।
ভয়ারিজমের অ্যাঙ্গলটা বাচ্চু না বললে আমার মাথায় আসতো না। ক্যানভাসের অনেকটা জুড়ে ক্লোজ আপে ডীপ নেক কালো পোশাক, মুক্তোর মালায় গ্রেস কেলি, হাতে ওয়াইন গ্লাস, বাঁদিকের কোণে জেমস স্টুয়ার্টের প্রোফাইল - সিনেমাটা দেখেছি, সীনটা সঠিকভাবে মনে পড়তো না অথচ; মানে, ঠিক কী ডায়ালগ ছিল, এর পরে কী হল মনে করতে পারতাম না-যতবার এখানে এসেছি , ততবারই ভেবেছি বাড়ি গিয়ে সিনেমাটা একবার দেখতে হবে; বাচ্চুকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর পেয়ে যেতাম ঠিকই এবং নিশ্চিত জানতাম , বাচ্চু এই দৃশ্যের সংলাপ শুধু নয়, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল , লাইটিং, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর সব খুঁটিয়ে বলে দিতে পারবে; কিন্তু আমি নিজেই একবার সিনেমাটা দেখে সীনটা খুঁজে নিতে চেয়েছিলাম। প্রতিবার ডেন্টিস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্টের দিন, এই ছবিটা দেখলেই একেবারে নিজস্ব একটা সময়ের জন্য আকুতি জন্মাতো- যেন বাড়ি ফিরছি, সমস্ত কাজ শেষ করে একা বসে সিনেমাটা দেখছি, নিজেই খুঁজে নিচ্ছি সীন, পরদিন সকালে বাচ্চুকে বলছি আমার আবিষ্কারের কথা। সে আর হয়ে ওঠে নি এতদিনেও।
আজ চেম্বারে রীয়ার উইন্ডোর সীন নয়, সম্পূর্ণ অন্য ছবি; ঘরের ঠিক মাঝখানে খাট- ডাবল বেড, ম্যাট্রেস - খাটের দুমাথায় দুজন, পুরুষ ও নারী মিলে বিছানায় চাদর পাতছে, দুজনের হাতে ধরা খুঁট, চাদর যেন এক আরোহীহীন চতুর্দোলা, যুগলের পরবর্তী ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করছে তার ভবিতব্য- হয় তালগোল পাকিয়ে নিচে পড়বে অথবা ম্যাজিক কার্পেটের মতো উড়ে বেরিয়ে যাবে; দুটি অবয়বের দেহভঙ্গিমা সহযোগিতার নয় একেবারেই বরং তারা যেন টেবল টেনিস বোর্ডের দুদিকে দুই প্রতিযোগী। জানলা দিয়ে আলো আসছে, গ্রিলের ডিজাইন আলপনার মতো দেওয়াল জুড়ে।
অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েটি এটা সেটা গুছিয়ে রাখছিল আমার পাশে। কুলকুচির জন্য জলভরা কাপ, টিস্যু, আগেরবারের এক্সরে রিপোর্ট; বলছিল- "ডেন্টিস্ট আগের পেশেন্টের কাজ শেষ করেই আসবেন, বেশি দেরি হবে না, এই অসুবিধে টুকুর জন্য আন্তরিক দুঃখিত। "
আমি বললাম, " আপনি জানেন এই ছবিটা এখানে কেন?"
মেয়েটি ছবির দিকে তাকায়, তারপর আমার দিকে - "অনেকদিন ধরেই তো রয়েছে ছবিটা। আপনি কতদিন আসেন নি?"
- এক বছর আগে এসেছিলাম, তখন তো..
- জেডি মানে নতুন ডেন্টিস্ট জয়েন করার পর ছবিটা বদলালেন স্যার-
-নতুন ডেন্টিস্ট?
-হ্যাঁ জেডি। আপনার স্কেলিং জেডিই করবেন। এনি প্রবলেম, ম্যাম?
- ছবিটা কার আঁকা, জানেন?
মেয়েটি মাথা নাড়ে দুদিকে। "রিল্যাক্স করুন, এক্ষুণিই আসবেন জেডি। ওঁকে জিজ্ঞাসা করে নেবেন। "
-ছবিটা কি জেডির আঁকা?
-জানি না ম্যাম।
ডেন্টাল চেয়ারে আধশোয়া হয়ে আমি আবার ছবির দিকে তাকাই, মেয়েটির মুখের আদল নিজের মতো লাগে - যেন আমিই দাঁড়িয়ে রয়েছি চাদরের খুঁট ধরে; অনেকটা কাল রাতের স্বপ্নের মতো - মুখ দেখা না গেলেও প্রতীতি জন্মায়- এ আমিই, আর কেউ নয়। ফ্রেমের ভিতরে আমি যেন চাদর পাততে গিয়েও থেমে রয়েছি। ওদিকের অবয়বটি খানিক নুয়ে- যেন ম্যাট্রেস ঢেকে ফেলতে অত্যন্ত আগ্রহী, আমিই যেন তা হতে দিচ্ছি না, যেন একবার চাদর পেতে ফেললেই দেওয়ালে আলো ছায়ার নকশা সম্পূর্ণ মিলিয়ে যাবে; সব আলো সব রঙ শুষে নিয়ে ফোকাসে থাকবে ভয়ংকর রকম ফ্যাটফেটে সাদা এক বিশাল চাদর। ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে হঠাৎ দম আটকে আসে যেন এক বিশাল ভারি চাদরের তলায় চাপা পড়ে যাচ্ছি। চেয়ার থেকে লাফিয়ে নামি, তুলে নি ব্যাগ, সটান হাঁটা মারি চেম্বারের বাইরে। আবার সেই সেন্সর লাগানো সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নেমে আসা, দু বার টুং টুং বেল, তারপর দরজা খুলে বেকারির সামনের বাস স্টপ, কবলস্টোন, গির্জেঘর। রুটের বাস আসছিল। আর মিনিটখানেক। তারপর বাস এসে দাঁড়াবে এই স্টপে, আমাকে নিয়ে যাবে কলেজে, তারপর বাচ্চুর কাছে; রাতে বিরিয়ানি, বন্ধু সমাগম, টেবিলের ঢাকা, বিছানার চাদর তোলা আর পাতা। আর যদি না উঠি এই বাসে? কী হয় যদি না ফিরি? সমুদ্রের জীবজগৎ পেরিয়ে বিরাট ক্রিকেট মাঠ, তারপর জঙ্গল, নেটবিহীন। হয়তো সেই লেখকের কাছে যাবো, সকাল নটার আগে পৌঁছে যেতে হয় যাঁর কাছে , থামলে চলে না। হয়তো ডেন্টিস্টের চেম্বারের ছবির শিল্পীকে খুঁজব। অথবা বসে থাকব নির্জন গ্যালারিতে, লিখে ফেলব আজকের কথা। সাদা চাদরের দু কোণা শক্ত করে ধরে রাখার মুহূর্তটা ফ্রিজ করে দিতে হবে। এক্ষুণি। বাস স্টপ থেকে ডেন্টিস্টের চেম্বার দেখা যাচ্ছিল- দুপুরের রোদ পড়ে হলদে কমলা। জানলা থেকে হাত নাড়ল কেউ ।
মোবাইল থেকে সিম খুলে দু টুকরো করে ছুঁড়ে ফেললাম রাস্তায়। বাস চলে গেল তার ওপর দিয়ে। হাঁটতে শুরু করেছি। বড়মাসিকে ফোন করব না আর। ফোনের অপেক্ষা করতে করতে করতে করতে বড়মাসি শিখে যাবে একটা নতুন জাপানি শব্দ। খুশি হবে বড়মাসি। খুব। আমি জানি।
ঋণস্বীকার ঃ টম ওয়াট্টাকুজির আঁকা ছবি
প্রথম প্রকাশঃ নান্দীমুখ গল্প সংকলন , বইমেলা ২০২৬
Comments
Post a Comment