Posts

মুক্তধারার বাঁশীওলা

১৩২৮ বঙ্গাব্দের চৈত্রসংক্রান্তির শান্তিনিকেতন ।'মুক্তধারা' লেখা শেষ হ'ল রবীন্দ্রনাথের। ১৪১৭ বঙ্গাব্দে মুক্তধারার প্রাসঙ্গিকতা বিচারে বসেছে সে। মাঝখানে প্রায় নব্বই বছর। প্রাত্যহিকতায়, জীবনচর্যায় মুক্তধারার চরিত্রসমূহের, রূপকের ওতপ্রোত অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব প্রমাণ করবে মুক্তধারার প্রাসঙ্গিকতা। সে পারিপার্শ্বিক জীবনচর্যার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চেষ্টা করবে মুক্তধারার রূপক। খুঁজবে শিবতরাই, উত্তরকূট তার দৈনন্দিনে। এই দৈনন্দিন, তার চর্যা যে এমন-যা দেখে সে তার চতুর্পার্শ্বে- তার কর্মক্ষেত্রে, তার দৈনন্দিনে, যা পড়ে সে-মিডিয়ায় , দ্রুত চোখ বুলিয়ে যাওয়া পেপারব্যাকে অথবা নিছক ব্লার্বে-মুক্তধারার চরিত্রদের অস্তিত্ব কি কোথাও প্রত্যক্ষ করেছে সে? কোথাও? কোনো অনুষঙ্গে তার কি কখনও মনে এসেছে শিবতরাই?অভিজিৎকে খুঁজেছে সে কখনও? তার দৈনন্দিনে? অথবা পেয়েছে খুঁজে?বিভূতিকে দেখেছে? শুভ্র বস্ত্র লুটিয়ে কেউ কি ডেকে যায়-'সুমন! আমার সুমন!'? নব্বই বছরে জীবনচর্যা বদলেছে। আমূল। বঙ্গাব্দ শব্দটি-ই বিদায় নিয়েছে দৈনন্দিন থেকে। নেই চৈত্রসংক্রান্তিও। আছে শপিং প্লাজা, মাল্টিপ্লেক্স, সেলফোন, আইপড। রিয়ালিটি শো।...

সিডনির পুজো, ২০০৯

ক্যালেন্ডারে মাসটি সেপ্টেম্বর। ঋতুটি শরৎ নয় যদিও।  লেপের আরাপ বিদায় নিচ্ছে ক্রমশঃ, বৃক্ষশাখা নিষ্পত্র নয় এই মুহূর্তে, জ্যাকারান্ডা বদলে দেবে আকাশের রং -কিছুদিন পরেই, ঘড়ির কাঁটার একঘন্টা এগিয়ে যাওয়া আসন্ন, পোলেন অ্যালার্জি আর হে ফিভার।  ভরা বসন্ত এই সময়। এই শহরে।  এই গোলার্দ্ধটিতে। অথচ, কোথাও শরৎ এখন।  নীলকন্ঠ পাখিটি তার উড়ান শুরু করেছে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, হাওড়া ব্রিজ, অপেরা হাউজ, হারবার ব্রিজ। স্কাইলাইন বদলে যায় শুধু।  পুজো আসে । এই শহরেও। Ï শউলিবিহীন যদিও। বছর আড়াই আগে , তুমুল অস্ট্রেলিয়ান সামারের তুঙ্গমুহূর্তে, যখন বুশফায়ারে ঝলসাচ্ছিল ভিক্টোরিয়া, ঘামে জবজবে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন যে সময়, এসেছিলেন তিনি। সিংহবাহিনী।  পদ্মটি ছিল না সে দিনও।  নিউ সাউথ ওয়েলস আর্ট গ্যালারিতে-'গডেস-দ্য ডিভাইন এনার্জি' প্রদর্শনীতে। থিম হয়েই এসেছিলেন-'দুর্গা -ক্রিয়েটিং আ গডেস। একচালা ট্রাডিশনাল প্রতিমাটি গড়েছিলেন কৃষ্ণনগরের নিমাই চন্দ্র পাল মশাই। মুর্শিদাবাদ থেকে এসেছিলেন ঢাকি ছয়জনা। নির্মাণের জাদুতে, পুজো আর বিসর্জনের ঐশ্বর্যে বিদেশী দর্শককুল স্রেফ হতবাক হয়েছিলেন সেদিন। সে ...

দয়াময়ীর কথা

Image
বুধমন্ডলী আজ্ঞা করেন গ্রন্থ পর্যালোচনা, সম্পাদক দাবী করেন পুস্তক সমালোচনা, বন্ধু জানতে চান পাঠপ্রতিক্রিয়া– এক্ষণে আপনার মনোভাবটির প্রত্যাশী, পাঠক। হে পাঠক, ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড়চ্ছেন আপনি, বঙ্গভাষায় লেখাপত্তরের সুলুকসন্ধানে আপনার আগ্রহ কম- জানি তা। উপরোধে অথবা সময়ে কুলোলে বড়জোর ব্লার্বে চোখ বুলোন আলতো। তবু, হে নবীন পাঠক, আসুন, আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিই এই বইটির সঙ্গে। সংক্ষেপে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৮ সালের লীলা পুরস্কারপ্রাপ্ত বইটি– দয়াময়ীর কথা। লেখক– সুনন্দা সিকদার। প্রকাশক গাঙচিল। নয়নশোভন প্রচ্ছদখানি। সুচারু। মুদ্রণে পরিপাট্য। বিনিময়মূল্য দেড়শো টাকা। এ লেখার প্রথম প্রকাশ ‘অন্তঃসার’ পত্রিকায়। পরবর্তীসময়ে আরো কিছু সংযোজনে– এই বইটি। ১৯৫১ থেকে ১৯৬১ সালের পুববাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের শৈশবস্মৃতি- এক বালিকার। আসুন, বইটি খুলি। পাতা ওল্টাই। শৈশবের দশটি বছর পূর্ববঙ্গে, নিঃসন্তান পিসিমার কাছে। তারপর পশ্চিমবঙ্গে মা বাবার কাছে আসা। শৈশবস্মৃতির দশটি বছর। স্মৃতি যেমন হয়– শৈশবের স্মৃতি যেমনটি হয়– কিছু কথা, কিছু দৃশ্য অতিতীব্রতায় প্রোথিত হয় অন্তরে– বাহিত হয় জীবনভর। কিছু স্মৃতি– সা...

গেনজি-দ্য ওয়র্ল্ড অফ দ্য শাইনিং প্রিন্স

এক হাজার আট সালে মুরাসাকি শিকিবু লিখেছিলেন রাজকুমার গেনজির কাহিনী। সহস্র বত্সর পূর্ণ হ'ল। গেনজি-দ্য ওয়র্ল্ড অফ দ্য শাইনিং প্রিন্স নামাঙ্কিত প্রদর্শনীটি এই উপলক্ষ্যেই। শুরু হ'ল বারই ডিসেম্বর, চলবে পনেরই ফেব্রুয়ারি অবধি। আর্ট গ্যালারি অফ নিউ সাউথ ওয়েলসের এশিয়ান গ্যালারিতে। প্রবেশ অবাধ। পন্ডিতরা তর্ক করুন,গেনজির উপাখ্যানই প্রাচীনতম উপন্যাস কি না, তুলনায় আসুক প্রথম শতকের ল্যাটিন স্যাটায়ারিকা, তৃতীয় শতকের গ্রীক এথিওপিকা অথবা সপ্তম শতকের সংস্কৃত কাদম্বরী। চুলচেরা বিশ্লেষণ চলুক উপন্যাসের বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি নিয়ে, সাড়ে চারশো চরিত্র সম্বলিত আখ্যানের গঠনগত ও মনস্তাত্বিক জটিলতা নিয়ে। ইয়াশুনারি কাওয়াবাতা নোবেল প্রাইজ অ্যাকসেপ্টেন্স স্পীচে বলুন, "দ্য টেল অফ গেনজি ইজ দ্য হায়েস্ট পিন্যকল অফ জাপানীজ লিটারেচার।" বলুন,আজ অবধি কিচ্ছু লিখতে পারি নি আমরা যা গেনজিকে অতিক্রম করে যায়। আমাদের শ্রবণ দ্বার উন্মুক্ত পন্ডিতের তরে; দর্শনে থাকুন প্রিয়দর্শন রাজকুমারটি-হাজার বছর পার হয়েও এখনও কি অনায়াস প্রভাব ফেলছেন জাপানের শিল্পমাধ্যমে। আমরা অবাক হয়ে দেখি। দেখি আর দেখি। দেখব,সম...

শূন্যের ভিতরে ঢেউ

'কোন্‌টা যে প্রেমের কবিতা আর কোন্‌টা নয়, তার ঠিক হদিশ করতে পারি না আমি... তাই কোনো বন্ধু যখন বলেন প্রেমের কবিতা আমি লিখিইনি, কখনো সেই প্রস্তাবে আমার একটা সায়ই থাকে। অথচ, প্রেম ছাড়া লিখেছি আর ক'টা?' শঙ্খ ঘোষ ১ 'আনন্দে চিরায়ু চাও লগ্ন তুমি প্রত্যহের স্রোতে। উদাত্ত প্রান্তর জুড়ে দুপুরের রৌদ্র পায় ছুটি- বুকের অনন্ত ইচ্ছা ছুটে আসে ভূমিগর্ভ হতে দুঃখের সবুজ গুচ্ছে তোমার সম্পূর্ণ হাত দুটি।' তুমি তার নাম জানতে চেয়েছিলে-সে মাথা নেড়েছিল দুদিকে-জানা যায় না, জানা যায় না কিচ্ছু জানা যায় না-তুমি তার ঘ্রাণ পেতে চেয়েছিলে প্রেমে অপ্রেমে, শরীরে, মিলনে,বর্ণ গোচর করতে চেয়েছিলে তুমি-ছুঁতে চেয়েছিলে তাকে.... সে যদি হয় এমন কেউ, যাকে তুমি চেনো। অথবা জানো। হয়তো চেনো, কিন্তু জানো না। কিম্বা জানো, চেনো না। হয়ত একত্রে বসত। এক ছাদের তলায়। কিম্বা সাক্ষাৎ। শুধুই সাক্ষাৎ।কদাচিৎ। হয়তো প্রতিদিন। প্রতিনিয়ত। ভীড়ে। কিম্বা নির্জনে। একান্ত নিভৃতির দর্পণে। হয়তো সে হেঁটে যায়। একা। আর তুমি রয়েছ তোমার নিভৃতির ব্যালকনিতে।অথবা হাঁটছ তার পাশে। সে হাঁটে । ভোর হয়। তুমি তাকে দেখ হেঁটে যেতে তার ছায়ার সঙ্গে।...

প্রবাসীর বর্ণমালা

সে হাঁটে। ওভারকোট, ভারী জুতো, মোটা দস্তানা। হাত জড়িয়ে খুকীটি। স্নোসুটে, রামধনু উলের গলাবন্ধে।পায়ের নীচে বরফ। তুষারাবৃত নিষ্পত্র বৃক্ষশাখা। আকাশের রঙে ছাই ওড়ে যেন। সে হাঁটে, সঙ্গে খুকীটি। খুকীর হুডটিতে আলতো হাত রাখে সে-কি ভাবিস খুকী? কি ভাবিস? -Poem, mummy. A poem. Just came to my mind. ************ ই-মেইল ১ মা, অভ্যস্ত হয়ে উঠছি আবার দৈনন্দিন ব্যস্ততায়। বরফে। মেইল করা হয় নি ক'দিন। ভালো আছ তো? খুকী ভালো। আজ পদ্য বাঁধলো মুখে মুখে। তবে ইংরিজিতে। 'Skating on the snow/ on a pair of broken skis/The snow is turning red/ I think , am nearly dead.' সকালের মুডটা ভালো ফুটেছে, বলো? বাংলায় কি ও আরো ভালো এক্সপ্রেস করতে পারতো নিজেকে? জানি না, আমি খুব বেশি জোর করছি কি না এব্যাপারে! বাংলা এখন আর বলতেই চায় না। পরে লিখছি আবার। এখন ইউনিভার্সিটির তাড়া। ই-মেইল ২ অরিত্র, অনেকদিন মেইল করা হয় নি তোকে।কলকাতা থেকে ফিরেছি অনেকদিন।তারপর আবার মানিয়ে নেওয়া রুটিনে, ব্যস্ততাও গেল নানাভাবে। খুকীকে নিয়েও একটু ঝামেলা গেল কদিন। সেরকম কিছু না। আসলে এখন একদম বাংলা বলতে চায় না। সমস্তদিন ডে কেয়ারে কাট...

প্রস্তুতিপর্ব

এই খেলাটা একা খেলতে হয়। একা একা। নিজে নিজে। শুধুই নিজের সঙ্গে।খুব কিছু লম্বা নয় খেলার সময়টুকু। আধঘন্টামত।কিছু কমই হয়তো। খেলাটা একদিন নিজেই শুরু করেছিল ও। নিয়মকানুন ঠিক করেছিল। কিম্বা হয়তো খেলতে খেলতেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। শুধু এখনও জানে না খেলা আরম্ভের সময়টা। ঠিক কখন্ শুরু হয়। একটা হুইশলের আওয়াজ হয় কোথাও। কোথাও একটা। আর ও খেলতে শুরু করে দেয়। আজ যেমন, এই যে মধ্যরাত এখন, সব কিছু চুপচাপ,-একটু আগে অন্য একটা খেলা খেলছিল ও। ওরা। সেটা দুজনের খেলা। সে খেলারও নিয়মকানুন আছে। সব খেলার মতই। নিয়মকানুন, শেষ, শুরু। হয়তো একটা ছোঁয়া দিয়ে শুরু হওয়া-হাত কিম্বা ঠোঁট কিম্বা কোমর। জিভ, আলজিভ। কপাল চোখের পাতা গলা বেয়ে বুক। তলপেট ঊরু পায়ের পাতা। আলাপ মধ্যলয় ঝালা। তুমুল ঝালা। খেলা শেষের সিক্ততা, অবসাদ। এই যে এখন, খেলা শেষ হয়ে যাওয়ার পরে ওরা শুয়ে রইল, -শুয়েই রইল-এর মুখ ওর কণ্ঠার কাছে। নি:শ্বাসের আওয়াজ। বুকের ওঠাপড়া। কাঁধ, গাল আর বালিশ নিয়ে একটা ছোট্ট ত্রিভুজ-তিনকোণা ফোকর একটা-সেখান দিয়ে রাস্তার আলো এসে পড়ল ওর আধবোজা চোখে। ও চোখ খুলল, ঈষত্ ঝাপসা দেখল সব। চোখ পিটপিট করে আবার চোখ বুজল। চোখ খুলল। মা...